Skip to content Skip to footer

অন্যের ধার করা গল্প দিয়ে আমি সিনেমা বানাই না —অং রাখাইন

সাক্ষাৎকার: আসিফ করিম চৌধুরী, শিয়ান শাহরিয়ার


অং রাখাইন, একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার প্রথম চলচ্চিত্র মং থেংগারি বা মাই বাইসাইকেল (২০১৫) চাকমা ভাষায় নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র। মুক্তির পরপরই ছবিটি নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। যদিও সেন্সরবোর্ড থেকে এর কোনো সদুত্তর মেলেনি। সাক্ষাৎকারটি যখন নেয়া হয় তখন অং তার স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি দ্য লাস্ট পোস্টঅফিস নির্মাণ শেষ করেছেন মাত্র, ২০১৯ সালও ক্রমশ শেষের দিকে। তখন এক বিকেল বেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোনো এক গোলচত্বরে বসে আমরা জানতে শুরু করি বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় একজন আদিবাসী তরুণ কীভাবে ধীরে ধীরে নির্মাতা হয়ে উঠলেন। পাঠক এখানে পাবেন তার সেই যাত্রার গল্প, আশা-হতাশা-প্রত্যাশার গল্প। 



ফিল্মে আসা কিভাবে হলো? পেছনের গল্পটা যদি বলতেন।

আমি রাখাইন সম্প্রদায়ের। ক্লাস সিক্স থেকে আমি পরিবারের গন্ডির বাইরে। যে কারণে আমি ছোটবেলা থেকে খুব স্বাধীনভাবে চিন্তা করি আর খুব স্বাধীনভাবে চলাফেরা করি। তাই জবাবদিহিতার ব্যাপারটাও নাই। ছোটকাল থেকেই পড়ালেখা আমার খুব অসহ্য লাগে। আমি কিন্তু ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক চর্চার সাথে যুক্ত। ভাইবোন সবাই গানবাজনা করতাম। কারো কাছে শিখতাম না। নিজেরা যা পারি তা। এভাবে এসএসসি পর্যন্ত চলল। পাসের পর বড় ভাই বলল ভবিষ্যতের কথা ভাবতে। হোটেল ম্যানেজমেন্টে পড়তে বলল যাতে বিদেশ যেতে পারি। কিন্তু এসবে আমার মন ছিল না। তাই শেষমেষ ভর্তি হলাম চারুকলায়, নারায়ণগঞ্জে। চারুকলায় ভর্তি হওয়ার পরই সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত নিই। তখনই আমার শিল্পের সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।

নারায়ণগঞ্জ আর্ট কলেজ?

হ্যাঁ। তারপর নারায়ণগঞ্জ আর্ট কলেজে পড়ার সময় ‘সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হই। সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির চর্চাটাও হতো। তারপর আর্ট কলেজের পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় চলে এলাম, ইউডা চারুকলায় ভর্তি হলাম। ওদিকে আবার আমি প্রাচ্যনাটে ঢুকে পড়লাম। তখন পুরোদমে গান করছি, আঁকছি, আবার ফটোগ্রাফি শুরু করেছি। এসব করতে করতে নিজেকে একটু একটু করে প্রস্তুত করছিলাম ছবি বানানোর জন্যে। ছবি নির্মাণকে লক্ষ্য রেখে ধীরে ধীরে এই মাধ্যমের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রপ্ত করার কাজে নামলাম। আমার জমে থাকা গল্পগুলো বলার তাগাদা অনুভব করছিলাম ভেতর থেকে। অন্যের ধার করা গল্প দিয়ে আমি সিনেমা বানাই না। আমার সামনে যেটাই দেখব আমি সেটাই নিয়েই ছবি বানাব। 

যেটা ছোটকাল থেকে দেখে আসছেন…

ফিল্ম মেকারের তো নিজেকে আগে দেখতে হবে। তাহলে সে দর্শকদের দেখাতে পারবে। প্রথমে আমি টুকটাক ডকুমেন্টারি বানানো শুরু করি। এর মাধ্যমে প্র্যাকটিস করছিলাম। ইউডা চারুকলায় পড়তে পড়তে আমি নিমকো ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সে চান্স পাই, ভর্তি হই। কোর্সটা আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এরপরে নুরুল আলম আতিক ভাই আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন।

আতিক ভাইয়ের সাথে কি আগে থেকে যোগাযোগ  ছিল ?

হ্যাঁ, ফেসবুকে যোগাযোগ শুরু হয়। তাঁর সাথে যোগ দিলাম ২০১১ কি ’১২ সালে। দেখলাম আমি যেরকম পাগলামি করতে চাই যেমন করে দেখতে চাই তিনি তেমনই। যদিও আমার কারো কাছ থেকে শেখার ইচ্ছা ছিল না, তবে আতিক ভাইয়ের সাথে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। 

মাই বাইসাইকেল-এর (২০১৫) পেছনের কাহিনিটা জানতে চাই।

আতিক ভাইয়ের সাথে কাজ করতে করতে ২০১২ এর ডিসেম্বরে আমি আমার মাই বাইসাইকেল ছবিটা শুট করা শুরু করি। এটা আসলে ক্রাউডফান্ডিং করে করা ছবি। প্রায় ৫০-৬০ জন টাকা দিয়েছিল। এরা সবাই আমার শুভাকাঙ্ক্ষী যাদের সাথে লেনদেনের কোনো প্রশ্ন নেই। আমার পরিবার ছিল নিম্নবিত্ত। আমার স্ত্রীই আমাকে ১৫-২০ ভরি স্বর্ণ দিয়েছিল। আতিক ভাই অনেক সাহায্য করেছিল। ছবিটা ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শুট করি, ২০১৩ এর জানুয়ারিতে শেষ করি। ছবিটার বাংলাদেশি প্রিমিয়ার হয় ২০১৪ এর নভেম্বরে। কিন্তু রিলিজ হয় ২০১৫ সালে। 

মাই বাইসাইকেল চলচ্চিত্রের দৃশ্য

স্ক্রিপ্টের কাজ শুরু করেছিলেন কখন?

এটি আমার দশ বছরের প্রজেক্ট ছিল। আমি ২০০২-০৩ এর দিক থেকেই লেখার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। শুটিং তো আসলে ১৫-২০ দিনের কাজ। সাধারণত একটা স্ক্রিপ্ট লিখতে আমার দু-তিন বছর লাগে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমার ছবিটা আমি চোখের সামনে দেখতে পারব না ততক্ষণ পর্যন্ত স্ক্রিপ্ট লেখা চলতে থাকবে। যেটা চাইছি সেটা না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি আছি। কিন্তু কোনো খুঁত রাখা যাবে না। 

এডিটিংও আপনি করলেন?

হ্যাঁ। আমি সবকিছু করি কারণ আমার আসলে করতে হয়। কাউকে রাখার মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমি চাইলেই অন্যদের মতো বিজ্ঞাপন, নাটক বানিয়ে ভালো রোজগার করতে পারতাম। কিন্তু কখনো বানাইনি। কারণ আমি ভয় পাই। এদেশে যারা ছবি বানাতে চায় তারা অনেক লেখাপড়া করে এসে শেষমেষ বিজ্ঞাপন বা নাটক বানানোর দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারণ এই শহরে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার তাগিদে একসময় সিনেমা থেকে সরে আসতে হয়। ছেলেপেলেরা আসে, সিরিয়াস কিছু বানানোর চেষ্টা করে, পরে দেখা যায় বস্তাপচা কোনো প্রোডাকশনে ঢুকে পড়ে—এভাবে তারা ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে হারিয়ে যায়। 

মাই বাইসাইকেল সিনেমাটা শুট করছেন কোথায়?

রাঙামাটিতে শুট করেছি। আর মাই বাইসাইকেল কিন্তু ভাল সিনেমা না। এটা আমার প্রথম কাজ, অনভিজ্ঞ কাজ। তবে খারাপ না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। এই যে ঢাকাকেন্দ্রিক একমুখী অডিও-ভিজ্যুয়াল, সেই একমুখিতা থেকে বের হওয়ার একটা উদাহরণ এই ছবি। মাই বাইসাইকেল আসলে একটা পথ তৈরি করেছে যার ফলে এখন আমরা ভিন্নধারার ছবি আরও পাব। আজ চাকমা নিয়ে হলো তো কাল মান্দি নিয়ে হবে। প্রক্রিয়াটা শুরু করে দিল মাই বাইসাইকেল। 

মাই বাইসাইকেল চলচ্চিত্রের দৃশ্য

আপনি তো রাখাইন সম্প্রদায়ের। কিন্তু মাই বাইসাইকেল চাকমা ভাষায় নির্মিত। এটা কেন হলো? 

এটা খুবই কমন প্রশ্ন। আমাদের ৪০-৫০টি সম্প্রদায়ের মধ্যে চাকামারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, প্রভাবশালীও। এদের এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস আছে, এদের ওপরেই নির্যাতন বেশি হয়েছে। চাকমা যদি বাঁচে তাহলে বাকি সম্প্রদায়গুলোও বাঁচবে। তাই তাদের অগ্রাধিকার দেয়া। তবে বাকিদের নিয়েও যে কাজ করব না তা নয়।

ছবিটার প্রদর্শনী হয়েছিল?

আমি জানতাম কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে এটাকে সেন্সর করে আটকে দেবে। তাই ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরিতে শুধু একটা শো করা আমার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু সে জায়গায় আমি দশ-বারোটা শো করতে পেরেছি। 

আপনার ছবি নিষেধাজ্ঞার কারণ ছিল শুনলাম বাংলা আর ইংরেজি ছাড়া আর কোনো ভাষার সিনেমা মুক্তির অনুমতি পাবে না। এ ব্যাপারে আপনার কী মতামত?

এটা আসলে অযুহাত। মূলত পেছনে কলকাঠি নেড়েছে আর্মি। ছবিতে ১০ সেকেন্ডের একটা শট ছিল। এটা ট্রেইলারেও আছে। আমি ছবিতে শুধু একটা ‘শক্তি’ দেখানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা ভেবেছে আমি তাদের দেখানোর চেষ্টা করেছি। এটা আসলে খুবই হাস্যকর বিষয়। সেন্সর বোর্ড তখন আমাকে ছবি থেকে ৫-৬ সেকেন্ড কাটতে বলেছিল। আমিও আমার ডিস্ট্রিবিউটরের স্বার্থে কেটেছিলাম। কিন্তু পরে তারা আবার ২৫ মিনিট কাটতে হবে বলে চিঠি দেয়। তখন সিদ্ধান্ত নিই আমার সেন্সর লাগবে না। আমি তাদের ঝেড়েঝুড়ে চলে আসি। 

এই ছবি নিয়ে এখনো আমি হুমকি-ধামকি পাই। তবে এসব নিয়ে আমি আর ভাবি না। আমাকে বেঁচে থাকতে হবে, ছবি করতে হবে। আমি আমার কাজ করে যাচ্ছি। আমি যেটা দেখি সেটাই তো বলব। এখানে তো মিথ্যা কিছু নাই। যখন আমি দেশে শো করতে পারছিলাম না, বিদেশে ফেস্টিভালে যাচ্ছিলাম, তখনও সেন্সরবোর্ড আমার পেছনে লেগেছিল। পরে বুঝলাম সেন্সরবোর্ডও অসহায়। সেন্সরবোর্ডের ওপরে আছে তথ্যমন্ত্রণালয়, আবার ওদের চাপ দিচ্ছে আর্মিরা। আমি যদি কালকে শো করি তাহলে ওরাই জবাবদিহির শিকার হবে। সেন্সরবোর্ড শুধু সিস্টেমের অংশ।

আর্মিরা তো পাহাড়ে অনেকদিন ধরে আছে। এরা পাহাড়ি অঞ্চলে কেমন প্রভাব ফেলছে?

আর্মিরা পাহাড়ে আসার কারণ হিসেবে বলে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে বা সীমান্তের নিরাপত্তা দিচ্ছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ মানলাম। এর সাথে সাথে কিন্তু এই ২০-৩০ বছর ধরে ওরা সেটেলারদের পাহাড়ে ঢুকিয়ে পুরো পাহাড় ধ্বংস করে দিয়েছে।

এখন সেটেলাররা যেভাবে পাহাড়ে ছড়িয়ে গেছে তাতে আদিবাসী সংস্কৃতি হুমকির মুখে কি?

হুমকির তো আর কিছু নেই! ধ্বংস হয়ে গেছে সব। সারা বিশ্বেই এখন সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘুর সংঘাত। এভাবেই ছোটোখাটো জনগোষ্ঠী ইতিহাস হয়ে যাবে। এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসি। সেটেলাররা এত সুন্দর প্রকৃতিকে ধবংস যে করছে তাতে আমাদেরই ক্ষতি হচ্ছে। গতবছর পাহাড়ধবসে কয়েকজন মারা গেল। এটাতো উপরওয়ালার দোষ না। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্যটা নষ্ট হয়ে গেছে। আদিবাসীরা তো মূলত পাহাড়ের ভেতরে খুব শান্ত পরিবেশে থাকে, তাঁদের চাওয়া-পাওয়াও অনেক সামান্য। যখন থেকে বান্দরবানের এলাকায় রাস্তা গেছে, তখনই এই রাস্তার মাধ্যমে প্রকৃতি ধ্বংসের শুরু হয়।

আদিবাসীরা কি দিন দিন শহরের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে?

আদিবাসীদের মাঝে চাকমারা কিন্তু অনেক শিক্ষিত। তারা ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন। এর ফলে তারা দিন দিন শহরমুখী হচ্ছে। অমিত চাকমার মত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে চাকমা জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা। শুধু যে চাকমারা শহরমুখী হচ্ছে তা কিন্তু না, অন্যান্যরাও হচ্ছে। কারণ ঢাকা হচ্ছে কেন্দ্র, যার প্রতি আসার প্রবণতা সবার মধ্যেই কাজ করে। এটা যে শুধু চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে হচ্ছে তা কিন্তু না, সকল গ্রামের মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায়। 

অং রাখাইন

সমকালীন ফিল্মমেকারদের ব্যাপারে আপনার মতামত কী? 

সমকালীন ফিল্মমেকারদের সাথে আমার চিন্তা-ভাবনায় মিলে না। দেখা যায় প্রথম বা দ্বিতীয় দিন মিলে, তৃতীয় দিন মিলে না। আর সবার সাথে যে সব কিছু মিলতে হবে তা কিন্তু নয়। সিনেমা হলে যদি ৪০০ দর্শক থাকে সবার সাথে যে আমার মনোভাব মিলবে তা কিন্তু নয় বা ৪০০ জনের দায় নিয়ে আমি সিনেমা বানাই না। আমি আমার সিনেমাই বানাই, এটা থেকে আমি এক বিন্দুও সরি না। কে কি বলবে, দর্শকরা কি বলবে তা ভেবে আমি সিনেমা বানাই না। স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ বলতে একটা কথা আছে, আমি যদি আমার সিনেমা বানাইতে না পারি, তাহলে সেটা আর থাকে না। 

পাহাড়ে ‘মাই বাইসাইকেল’ এর কোনো প্রদর্শনী  কি হয়েছে? ওদের সাড়া কেমন ছিল?

হ্যাঁ। রাঙ্গামাটিতে দেখানোর পরই শুরু হয়েছিল সেন্সরের ঝামেলা। ওদের সাড়াটা ভালোই ছিল। তবে আমার ইচ্ছা হচ্ছে ওখান থেকে নির্মাতা বের করে আনা, কিন্তু ব্যাপারটা তেমন সহজ না। তবে আমি এ ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছি, আমি আশাবাদী।

আন্তর্জাতিক মহলে কেমন সাড়া পেয়েছেন?  

প্রায় ২৫-৩০ টা ফেস্টিভ্যাল করা হয়ে গেছে। সাধারণত একটা ছবি দুই বছর পর্যন্ত ফেস্টিভ্যালে যায়। কিন্তু ২০১৫ এর ছবিটা এখনো ফেস্টিভ্যালে ঘুরছে, ইনভাইটেশন পাচ্ছে। আমাদের দেশের জন্যও কিন্তু এটা ইতিবাচক। এ পর্যন্ত ১০০-১৫০ টা শো হয়েছে। শুধু ফেস্টিভ্যাল না, বিভিন্ন ইন্সটিটিউশন, ইউনিভার্সিটিতেও আমার শো হয়েছে। আমার দেশে যদি আমি দেখাতাম কয়টা শো হইতো? কয়জন মানুষ দেখতো? এখানে তো ডিস্ট্রিবিউশনের কিছু নাই। এখন ভালো সিনেমা হলেও কিন্তু হল চালাবে না। ইউরোপে আমাদের মার্কেট আছে। আমাদের সিনেমা দেখার জন্য ইউরোপের দর্শক বসে আছে। যে দর্শকগুলি রেগুলার দর্শক। ওদের কালচারের একটা অংশ সিনেমা দেখা। 

হল বিমুখীতার জন্য দায়ী ধরা হয় বাংলা সিনেমার অশ্লীল যুগকে। এ নিয়ে আপনার কী ধারণা? 

বিকল্প ধারার নির্মাতারা কিন্তু এফডিসিকেন্দ্রিক না। এটা একটা কারণ। তাই যারা নতুন এফডিসিতে আসছে তারা কাদের দেখে শিখবে? সে তো সিনেমাই বানাইতে পারবে না। কারণ তার গুরুরাই তো অশ্লীল সিনেমা বানাচ্ছে। আসল ব্যাপার হচ্ছে ইন্সটিটিউট। আমাদের এখানে ইন্সটিটিউট নাই। ইন্সটিটিউট কিন্তু পরিচালক তৈরী করে না কিন্তু এক্সপার্টিজ তৈরী করে। লাইটের লোক তৈরী করে, ক্যামেরার লোক তৈরী করে। ফিল্ম মেকিং এর খুটিনাটি কাজের লোক তৈরি করার দায়িত্ব ইন্সটিটিউটের। ইন্ডিয়াতে পুনেসহ বেশ কিছু ইন্সটিটিউট আছে। ইন্সটিটিউট লাগে ইন্ডাস্ট্রির জন্য, পরিচালক বানানোর জন্য না। আমি তো ফিল্ম মেকিং পড়িনি। কাজটা তো একটা কালেক্টিভ আর্ট, একশোজন মিলে করা। তো, ইন্সটিটিউট একটা সমস্যা, দুর্নীতি আরো বড় সমস্যা। 

চলচ্চিত্রে দুর্নীতি? আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে?

সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতির কথাই বলছি। যে দেশে একশো ভাগ দুর্নীতি, সে দেশে শিল্প দাঁড়াতে পারে না। শিল্পের শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে সিনেমা। সিনেমাকে দাঁড়াতে দেবে না। গতবছর সুইজারল্যান্ডে গিয়ে বার্মার তিনজন ফিল্ম মেকারের সাথে আমার দেখা হয়েছে। তাদের কাছে জানলাম তাদের দেশেও ফিল্ম ইন্সটিটিউট নাই। সরকার তো আর্মি! শিল্পকে দাঁড়াতে দেওয়ার কোনো কারণ তো তাদের কাছে নাই! শিল্প সবসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে। আমাদের দুর্ভাগ্য হল চারপাশে এতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের যে শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের যুদ্ধ করার কথা ছিল তারাও বিক্রি হয়ে গেছেন। কেউ নিজেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, কাউকে ভয় দেখিয়ে চুপ করানো হচ্ছে, চাহিদা মিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মারাত্মক ক্রাইসিস এটা। আমাদের প্রতিনিধিত্ব করছে আজকে ক্রিকেট। বিশ্ব ময়দানে আমাদের একমাত্র পরিচয় ক্রিকেট দিয়ে। এই অবস্থা থেকে বের হতে অনেক সময় লাগবে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যদি পরিবর্তিত না হয়, বিশাল ঝামেলা তৈরি হবে।

মানে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি প্রস্তুত না এসব সম্ভাবনার জন্য?

ইন্ডাস্ট্রির সাথে এই সম্ভাবনা তৈরির বা প্রস্তুতির কোনো সম্পর্ক নেই। আগে প্রোডাকশন ছিল হলভিত্তিক, এখন একেবারেই হলভিত্তিক না। ইনকাম করার এখন হাজারটা সোর্স আছে। একটা ছবিকে হাজার জায়গায় বিক্রি করা যায়। অনলাইনসহ অনেক প্ল্যাটফর্ম আসছে। সেগুলো ব্যবহার করতে পারলে ভালো। 

কিন্তু ডিস্ট্রিবিউশনের অভাবে হচ্ছে না, নাকি?

বাইরের দেশে শপিং মলে মাল্টিপ্লেক্সে তিন চারটা হল থাকে, এক হাজার জনের হল, চারশো জনের হল, দুইশো জনের হল; বাচ্চাদের জন্য হল যেখানে বাচ্চাদের সিনেমা হবে। বসুন্ধরা সিটিতে যদি একটা পরিবার যায়, বাচ্চাদের জন্য বাংলা সিনেমা তো থাকেই না, বড়জোর হলিউডের সিনেমা। বিদেশে মাল্টিপ্লেক্সে আর্ট হাউজ সিনেমা বাধ্যতামূলক। চারজনের একটা পরিবার যাবে, তিনটা হলে ঢুকে যাবে, যার যার পছন্দ। এই অপশনগুলো আমাদের ডিস্ট্রিবিউশনে রাখতে হবে।  

ইদানীং বাংলাদেশে প্রায়ই দু-একটা সিনেমা বেশ আলোচিত হয়, যেমন লাইভ ফ্রম ঢাকা… 

হ্যাঁ, তা হয়েছে। তবে কথা বলতে হবে সাদকে নিয়ে। ওয়েলকাম করতে হবে। যেকোনো সময় যেকোনো ভালো প্রোডাকশন আসতে পারে। বরিশাল থেকে একজন হয়তো ভালো সিনেমা নিয়ে কানে যেতে পারে। ঢাকা শহরকে সে গুরত্বপূর্ণ মনেই করে না। এরকমও তো হতে পারে। এটাকে আমাদের ওয়েলকাম করতে হবে। কিন্তু সম্ভাবনাগুলা খুব খুচরা। একজন অং রাখাইন কী করছে না করছে তা দিয়ে কারো কিছু যায় আসে না, দেশের কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমার মতো দশজন যদি নিয়মিত সংগ্রাম করতে থাকে, তাহলে হয়তো কিছু সম্ভাবনা আছে। এখন সবাই বিচ্ছিন্নভাবে সংগ্রাম করছে। ইন্সটিটিউটের অভাব! তারপরও আমি সম্ভাবনা দেখি।

শিল্প কি আপনি নিজের জন্য নির্মাণ করেন, নাকি মানুষের জন্য?  

শিল্প আমি আগে নিজের জন্য নির্মাণ করি, তারপরে আশেপাশের মানুষকে আমার চিন্তা-ভাবনার জানান দেই। আমার নিজের গল্পগুলা বলতে চাই। টলস্টয় কী লিখেছে না লিখেছে সেদিকে না গিয়ে আমি যদি আমার নিজের গল্পটা বলি, সেইটাই আমার কাছে টলস্টয়ের চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের গল্প নিয়ে কাজ করা, তাকে নিয়ে আলোচনা করা- এইসবের প্র্যাক্টিস আমি খুব কম করি। কিন্তু আমি মাস্টারপিস সিনেমাগুলো দেখেছি, এখন আর দেখি না। বইও পড়ি না, ফিল্মও দেখি না। আমার আসলে দরকার নাই। আমার দেখার চোখই যথেষ্ট। এর বাইরে তো আমি সিনেমা বানাবো না।

(সাক্ষাৎকারটি ‘শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভাল ফর কালচারাল ডাইভার্সিটি অ্যান্ড পিস ২০১৯’ উৎসবে প্রকাশিত স্মরণিকা থেকে সংকলিত)

Leave a comment